Mon. Feb 17th, 2020

ISLAM NEWS 24

সুবেহ সাদিকের প্রত্যাশায়

বাংলাদেশ

ছাত্ররাজনীতিঃ নিষিদ্ধ হোক এই অন্ধকারের পাঠশালা

ছাত্ররাজনীতি সিদ্ধ কি অসিদ্ধ এবং তা নিষিদ্ধ হওয়া উচিত কি অনুচিত, এটা বিতর্কিত বিষয়। তিনটি পক্ষ এখানে দৃশ্যমান। ১. দলীয়-রাজনীতিবিদ ও এর উপকারভোগী শ্রেণী। এরা ছাত্ররাজনীতির ঘোর সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হোক তা এরা কিছুতেই চাইবেন না। ২. দলীয় রাজনীতি করেন না তবে রাজনীতিসচেতন শ্রেণী। এরা ছাত্ররাজনীতি আদৌ সমর্থন করেন না বরং তা নিষিদ্ধ হোক এটাই চান মনেপ্রাণে। ৩. মুযাবযাবীন–সুবিধাবাদী শ্রেণী। এরা দু’কূলেই কাত। যখন যেদিকে সুবিধা মনে করেন তখন সেদিকেই অবস্থান নেন।

এই বিতর্কিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় নীতি কিংবা জাতীয় সিদ্ধান্ত কী হওয়া উচিত তা শিগগিরই নির্ধারিত না হলে সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর মেধাবী ছাত্র আবরারের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড গোটা জাতিকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বারবার এরূপ হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য সৃষ্টির পেছনে যে দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তিই একমাত্র কারণ তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক দলসমূহ ক্ষমতা দখলের যুদ্ধে ছাত্রদের কীভাবে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করে এবং অপরাধী হতে উৎসাহ যোগায়। যাদের হাতে থাকার কথা ছিলো বই-খাতা-কলম, তাদের হাতে শোভা পাচ্ছে দেশিবিদেশি ভয়ঙ্করসব অস্ত্র আর ভারত-বার্মাহস নানান দেশ থেকে আমদানিকৃত মদ-হিরোইন-মরফিন-ইয়াবাসহ জীবনবিধ্বংসী নানান উপকরণ–যার শিকারে পরিণত হয়ে একদিকে যেমন অকালেই ঝরে যাচ্ছে কতো নিরীহ পিতামাতার নিষ্পাপ সন্তান, তেমনি অবৈধ বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে ধরাকে সরা-জ্ঞান করছে কুলাঙ্গার! এ যেন এক অন্ধকারের পাঠশালা, যেখানে রাজনৈতিক দলসমূহ ছাত্রসমাজকে তাদের ক্রীড়নকে পরিণত করে গোটা জাতি, জাতির ভবিষ্যত-প্রজন্ম–ভবিষ্যত-সম্ভাবনাকেই ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে, এই তিক্ত সত্য নিশ্চয়ই অস্বীকার করা যাবে না। ফলে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি এখন সময় ও জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে।

অবশ্য যখনই ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ওঠে তখনই রাজনৈতিক মহল থেকে ভাষা-আন্দোলন, ‘৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ‘৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন প্রভৃতিতে ছাত্রদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার অজুহাত তুলে ছাত্ররাজনীতি বহাল রাখার প্রয়াস চালানো হয়। তারা বুঝতেই চান না যে, রাজনীতি না করেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায় বরং তরুণের রক্তেই থাকে ভেঙে গড়ার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা, সত্য প্রতিষ্ঠার দুর্দমনীয় তেজ। অবশ্য তারা ভালো করেই জানেন যে, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হলেই ছাত্রদের মধ্যে মুক্তচিন্তা ও রাজনীতি-সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, এতে আর তারা ক্ষমতার লাঠিশক্তি হিসেবে ছাত্রদের পাবেন না। এটা নিঃসন্দেহে তাদের জন্য আতঙ্কজনক!

এই পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী এবং বিতর্কিত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমরা কোন্ পক্ষ কিংবা কোন্ পথ অবলম্বন করবো নিশ্চয়ই তা সর্বমঙ্গলের জন্য নির্ধারিত হওয়া উচিত।

এ কথা ধ্রুব সত্য যে, যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বর্জনের ক্ষেত্রে জ্ঞানীদের পরামর্শের বিকল্প নেই। জ্ঞানীরা দুই শ্রেণীতে বিভক্ত, আহলে-ক্বলব ও আহলে-দেমাগ। আহলে-ক্বলব হচ্ছেন সেইসকল জ্ঞানী–যারা দুনিয়া সম্পর্কিত জ্ঞানের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক জ্ঞানেরও অধিকারী, অর্থাৎ আওলিয়ায়ে কেরাম; আর আহলে-দেমাগ হচ্ছেন সেইসকল জ্ঞানী–যারা চিন্তাশীল, বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ও পণ্ডিত। প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তাহলে আমরা কাদের পরামর্শ গ্রহণ করবো? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর হচ্ছে, কোনো বিতর্কিত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে অবশ্যই আহলে-দেমাগদের ওপরে আহলে-ক্বলবদের প্রাধান্য দিতে হবে। আমরা বিশ্বের নানান রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পর্যালোচনা করে দেখেছি, বিতর্কিত বিষয়ে যেখানেই আহলে-ক্বলবদের ওপরে আহলে-দেমাগদের রায়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে সেখানেই বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

সুতরাং এ ব্যাপারে আমরা জাতির কাণ্ডারী, প্রখ্যাত দার্শনিক ও সমাজসংস্কারক, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশবাসীর শ্রদ্ধাপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ.-এর দিকনির্দেশনাকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতে পারি। ১৯৯৬ সালের ১২ই আগস্ট এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে তিনি বলেছিলেন–‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের কালো ধোঁয়া শিক্ষাঙ্গনের সর্বস্তরে যেভাবে আছর করেছে এবং স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক-চক্রের ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে ছাত্ররা যেভাবে তাদের প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তা জাতির জন্য নিঃসন্দেহে অশনিসঙ্কেত। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের অন্যতম উপায় আমার মতে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা। শিক্ষাক্ষেত্র থেকে আরম্ভ করে সমাজের সর্বস্তরের অরাজকতা, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধ করা ততোদিন পর্যন্ত সম্ভব হবে না যতোদিন পর্যন্ত কোমলমতি ছাত্রদের দলীয়-রাজনীতির কবল থেকে মুক্ত করা না যাবে।’

ছাত্ররাজনীতি কিভাবে বন্ধ করতে হবে তিনি তারও দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেন–‘ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে হলে যেমন ক্ষমতাসীন সরকারের সহনশীল হওয়ার প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বিরোধীদলের আন্তরিক উদ্যোগ। আমি দেশের সকল সচেতন নাগরিক, রাজনৈতিক নেতা ও সমাজকর্মীদের জাতীয় ঐক্যের বৃহত্তর স্বার্থে বিষয়টি বিবেচনা করে সক্রিয় ব্যবস্থা অবলম্বনের অনুরোধ করছি।’

বুয়েট-হত্যাকাণ্ডে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন তাকে আমরা সর্বান্তকরণে সাধুবাদ জানাই। হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে, এও আমরা আশা করি কিন্তু অপরাধের কারণ–ছাত্ররাজনীতি অব্যাহত থাকলে এক সন্ত্রাসীর ফাঁসির পরিবর্তে যে দশ সন্ত্রাসী তৈরি হবে না তার নিশ্চয়তা কি?

আমাদের সামনেই দেদীপ্যমান ১২ই রবিউল আউয়াল; সর্বকালের সেরামানব বিশ্বনবী মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর মহান জন্মদিন–পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী। আমরা এই পবিত্র দিনকে সামনে রেখে সকল রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সচেতন দেশবাসী ও সমাজকর্মীদের প্রতি হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ.-এর আহ্বানের পুনরাবৃত্তি করে বলবো–আসুন, আমরা ছাত্ররাজনীতি বন্ধের আওয়াজ তুলি, আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিষিদ্ধ হোক অন্ধকারের এই পাঠশালা, শিক্ষার চূড়ান্ত গৌরব নিয়ে মায়ের কোলে ফিরুক বিদ্যাপীঠের সমুদয় আবরার। আল্লাহ আমাদের তৌফীক দিন। আমীন!

—-🔸মুস্তাফীজ শিহাব🔸
(১২ই অক্টোবর, ২০১৯ খৃ.)